গল্প/ উপন্যাস
সুন্দর কালো বউ।
৫ ফিট ৪ ইঞ্চি, সুঠাম গঠনে দেহে ঘাম যেন শিশির বিন্দুর মত টপটপ করে পড়ছে। পড়নের লঙ্গিটাও বেশ পুরাতন হয়ে গেছে।
লুঙ্গির কোমরের অংশে লাল একটা গামছা দিয়ে কোমরটা খুব মজবুত করে বাধা। ডানে বামে দোল খেলেই সোহরাপ ভেন গাড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সোহরাপের বয়স এই ছাব্বিশে পা দিল। তার বয়সী ছেলে মেয়েরা এখনও পড়াশোনা করে বাবার হোটেলে খাচ্ছে। কিন্তু সোহরাপকে অনেক আগেই সংসারের হাল ধরতে গিয়ে নিজের পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছে। বাবা দিন মজুর একদিন কাজ করলে তিন দিন অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে থাকতো। সংসারই চলতো না আবার পড়াশোনা অনেক দ‚র। সাত বছর আগে কোন এক শীতকালে বাবা-মা তাকে বিয়ে করিয়ে দিয়েছিল লতা নামের পাশের গ্রামের একটা মেয়ের সাথে। সোহরাপ আর লতার সংসার জীবন সাত বছর কেটে গেলেও এখনও প্রযন্ত কোন বাচ্চা হয়নি। বাচ্চা হচ্ছে না তাই নিয়ে আশে পাশের মানুষ জন কানাকানি করলেও সোহরাপের তাতে কোন মাথা ব্যাথা নেই। সোহরাপের বাবা-মা ও মানুষজনের কথায় কোন পাত্তা না দিয়ে হাসি আনন্দেই দিন পাড় করছে। লতার নিজের কাছেই নিজেকে নিয়ে অনেক প্রশড়ব সাথে আবার ভয়। আমার কেন বাচ্চা হয়না? সমস্যা তার নিজের সে এটা ভেবেই মন মরা হয়ে দিন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে তার গায়ের রং কালো। স্বামী যদি আর একটা বিয়ে করে। এই দুশ্চিন্তায় ও লতা বহুরাত না চোখের জল ফেলেছে।
অন্য দিনগুলোর মতই আজ দুপুরের দিকে বাড়িতে টোকার মুখে ভেন গাড়িটা রেখে বাড়ির ভেতর ঢুকলো। রানড়বা ঘরে একটু ঝুকে বলল, এইগুলা ধর।
লতা ও চুপ করে সোহরাপের হাত থেকে বাজারের ব্যাগ আর লাউটা নিজের হাতে নিয়ে পাশে রেখে চুলার মুখে খড় দিল।
সোহরাপ ঘর থেকে তাল পাখার পাখা নিয়ে রানড়বা ঘরে ফিরি পেতে বসে বলল, কি হইছে তোর? মন খারাপ করে বসে আছোস কেন?
লতার কোন উত্তর না পেয়ে, সোহরাপ আবার জিজ্ঞাসা করলো।
ভোন্দার মত বইয়া রইলি যে, মুই কি জিগাই তোর কানে যায়না।
লতা কোন উত্তর না দিয়ে ভাতের পাতিল নিয়ে সোহরাপকে পাশ কাটিয়ে ঘরে চলে গেল। সোহরাপও ওখানে বসেই নিজের মত করে হাত পাখা নাড়ছে। ঘরে ভাতের পাতিল রেখে যখন রানড়বা ঘরে আবার ঢুকতে যাবে এমন সময় সোহরাপ লতার হাত ধরে জিজ্ঞাসা করে।
কিরে আব্বায়- মায় কিছু কইছে?
কি হইবে আবার? কিছু হয় নাই। হাত ছারেন।
কিছু না অইলে তুই মুক কালা করে আচোস কেন?
ছারেন তো। বলে হাত ছাড়িয়ে লতা রানড়বা ঘরের ভিতর গিয়ে ফিরিতে বসে চুলার মখের খড় ভিতরে দিয়ে দিল।
*****
ছেলেটা ঢাকা থেকে কাল রাতে বাড়িতে আসলো। আর আজ তোদের ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। টিপু ঢাকার একটা কলেজে পড়ে। টিপুর ভাই বিদেশ থাকে। টিপুর পড়াশুনার টাকা দেওয়া নিয়েই তার ভাবী ঝগড়া শুরু করে দিছে। টিপুর বড় ভাইকে ফোন দিয়ে তার সাথেই ঝগড়া করছে। যে টিপু আজ বাড়িতে আসছে। তার নাকি টাকা লাগবো। তার পিছনে মাসে মাসে এত টাকা খরচ কেন করবে তার স্বামী। সবাই কে খাওয়াইতেছে এটাই তো অনেক।
ভাবী এগুলো আপনি কি বলেন? ভাইরে বিদেশ পাঠাইছে কে? আমরাই তো নাকি আপনার বাপ-মায়ে?
কি এত বড় কথা আমার বাপ মা তুলে গালিগালাচ করে। এভাবে চিৎকার করতে করতে টিপুর ভাবী পুকুরের পাড়ে চলে আসলো। নিজে একা একা তার স্বামীকে গালিগালাচ করছে
গোলামের পুত দানের বাক্স খুলে বসছে। এত কিছু করলেও যে ওর নাম হইবে না তা আমি এত করে বলি। তা শোনে না। আজ ফোন দেক না একবার। আমি ওর ভাত খামুনা।
ভাবী আপনি কি বলেন, আমার ভাইয়ের টা আমি খাই। তাতে আপনার এত জ¦লে কেন?
কি আমার স্বামীর টাকা।
ও মা এ কেমন কথা আপনার স্বামী মানি। আপনার স্বামীর আগে আমার ভাই। আমার ভাই না হলে আপনার স্বামী হতনা।
পুকুরের দুইপাড় থেকে মানুষের জড় হয়ে গেছে। এটা তেমন কিছু না। কয়েকদিন পর পরই এই সার্কাস হয়। কিছু হতে না হতেই ঘর থেকে বের হয়ে পুকুরের পাড়ে এসে চিৎকার চেচামেচি করবে। আর মানুষ জড় করবে। ঘরের ভেতর বসে একটু কথা কাটা কাটি হলেই
ও মাগো আমারে মাইরা ফেলাইলো বলে চিৎকার দিয়ে পুকুরের পাড়ে এসে পড়বে। এই কান্ড কারখানা মানুষেরা এখন বুঝে গেছে। তারপরও মানুষে বিনা টিকিটে একটু সার্কাস দেখে যায়। এতটুকু বোঝার বুদ্ধি টিপুর ভাবীর হয়নি। মেট্রিকটাও পাশ করেনি । কিন্তু ভাব খানা যেন সে এমবিএ পাশ। মোটকথা টিপুুর ভাবী চায়না এই পরিবারের সাথে তার স্বামীর কোন যোগযোগ থাকুক। টিপুর ভাই বিদেশ গিয়ে যে টাকা পাঠাবে তা শুধু তার কাছে দিয়ে সে ভিক্ষার মত করে যাকে মন চাইবে দিবে আর না চাইলে দিবেনা।
*****
এদিকে ঘোর। আমার দিকে ফের। তারপরও লতা উল্টা পাশ ঘুরে শুয়ে আছে। হাত দিয়ে সোহরাপ নিজের দিকে লতাকে ঘুরিয়ে বলে
শোন বউ তোরে একটা কতা কই। তুই সারাদিন কি লইয়া মন খারাপ করে থাহোস আমি সবই বুঝি। আমাদের একটা বাচ্চা হইলে ভালই হত। কিন্তু এখন হচ্ছে না সেটার জন্য তো আমরা সব কিছু নষ্ট করতে পারিনা। তুই মন খারাপ করিসনা। দেহিস আমাগোও সুন্দর একটা বাচ্চা হবে।
আমার মন খারাপ না।
তাইলে সারাদিন এত চুপচাপ থাহোস কেন?
এমনেই।
এমনেই নাহ? তুই ভাবোস আমি কিছু বুজিনা?
কি বোজেন?
তুই কেন বোজোসনা? তোর ওই চুপচাপ থাকা দেকলে মোর ভালো লাগেনা।
হ.. এহন তো মোর চুপচাপ ভালো লাগে না। আর কিছু দিন পর হয়তো মোরেই ভাল লাগবে না। তহন অন্য কেউরে নিয়া সংসার করবেন।
লতার এমন কথা শুনে সোহরাপ আর হাসি থামিয়ে রাখতে পারলো না। সোহরাপের এমন প্রানবন্ত হাসি দেখে লতা লজ্জায় আবার উল্টা পাশ ঘুরে গেল। লতাকে সোহরাপ নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল
আরে শোন, তুই এই ভয় পাস যে আমি আবার আর একটা বিয়া করমু।
লতা এখন একটু শক্ত করে অধিকারের সুরে বলল
হ ভয় করি। আমি কালো। আবার আমার বাচ্চা হয়না আমনে আর একটা বিয়া করতেই পারেন। আমনেরে কেমনে বিশ্বাস করমু?
আরে ধুর পাগলী, আমার মাথায় কি ভুত চাপছে যে, আমার এততততত সুন্দর কালো একটা বউ থাকতে আবার বিয়া করমু। তুই যে আমার সুন্দরররররর কালো একটা বউ তোরে ছারা আর কেউরে মোর ভালই লাগে নারে।
*****
সোহরাপ ভ্যানের যাত্রী নামিয়ে পাশের চায়ের দোকানে বসছে একটা চা খাবে। তখন চায়ের দোকানের টিভিতে খবর চলছিল। সেই খবরে দেখল একটা নবজাতক বাচ্চা ডাস্টবিনে পাওয়া গেছে। কে বা কারা এই সদ্য নবজাতকে কাটুনে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে গেছে। কেউ বলতে পারেনা। চায়ের দোকানের লোকজনের মধ্যে আফসোসের হই হই পড়ে গেছে। কেউ আবার নিন্দা করছে। আবার কেউ ওই সব মেয়েদের কে উদ্দেশ্য করে গালিগালাচ করছে। সোহরাপ সেখান থেকে চা খেয়ে ভ্যানটা ঘুরিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। ভ্যান গাড়িটা আজ বাড়ির ভিতরে নিয়ে তালা মেরে ঘরের ভিতর ঢুকে শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষন পর লতা ভ্যান গাড়ি দেখে ঘরের দিকে এসে দেখতে পেল সোহরাপ চৌকিতে শুয়ে আছে।
কি হইচে আপনার। বাইরে থেকে এসেই হুইয়া পরলেন যে।
কিছু হয়নাই। তুই যা তোর কাজ কর।
না আপনার মুখটা এমন দেহায় কেন? কি অইচে মোরে কন?
কিছু অয় নাই রে বউ। তুই যা।
লতা আর কোন কথা না বলে রানড়বা ঘরে চলে গেল। স্বামীল এমন মলিন আর চিন্তিত মুখ দেখে লতার ভীতরটা ছটফট করতে শুরু করলো। একটা অজানা ভয়ও কাজ করছে। কিছু একটা যে হয়েছে লতা তা খুব ভাল করেই বুঝতে পারছে।
তিন চার দিন হয়ে গেল সোহরাপ ভ্যান গাড়ি নিয়ে বের হয়না। কি যেন একটা ভাবছে। সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরে কেউ জানেও না। সকাল হলে বের হয় আর সন্ধ্যার দিকে বাসায় আসে। দুপুরের খাবারও খেতে আসেনা। সোহরাপের বাবা-মা ও বিষয়টা লক্ষ করলো।
কি রে বাপ তোর কি হইছে?
না মা। মোর কিছু হয় নাইতো।
তুই যে তিন চার দিন ধরে ভ্যান চালাস না। ঠিকমত বাড়ি থাকোস না। খাইতে ও আসোসনা। মোরে ক, কি হইছে তোর?
তুই এহন যা রে মা। মোর কিছু হয় নাই। মুই কাইলকো ভ্যান লইয়া বাইরামুনে।
সোহরাপের মা ঘর থেকে বাহির হয়ে তার নিজের রুমে এসে নামাজে দাড়ালো। বাড়িটা আস্তে আস্তে নিরব হতে শুরু করলো। দ‚র থেকে শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে। লতা সোহরাপের পাশে ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে পড়লেও লতার চোখের পাতায় কোন ক্লান্তি নেই। চোখের পাতায় যেন ঘুমের বালাই নেই। অন্যদিকে সোহরাপও পাশ ঘুরে শুয়ে কিছু একটা ভাবছে।
সকাল সকাল ভ্যান গাড়ি বের করার শব্দে লতার ঘুম ভেঙ্গে গেল। লতা বুঝতে পারলো যে তার স্বামী ভ্যান গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছে। তড়িঘড়ি করে বিছানা ছেড়ে দরজায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে মাথার চুল বাধতে বাধতে বলল
এত সকাল সকাল আমনে কোন হানে যান?
বউ শোন। আজ মোর আসতে দেরী অইবো। মায় রে কইস।
কেন? দেরী অইবো কেন?
হ, মুই একটু ক্ষ্যাপ লইয়া দ‚রে যামু।
এই বইলা ভ্যান গাড়ি টানতে টানতে বাড়ি থেকে বের হইয়া গেল সোহরাপ। লতাও ঘর থেকে নেমে ভ্যানের পিছন পিছন হেটে উঠান অবদি গেল। স্বামীকে যতক্ষন দেখা গেল ঠিক ততক্ষন দাড়িয়ে ছিল। পিছন ঘুরে সোজা শ্বাশুড়ির ঘরে চলে গেল।
আম্মা, আমনের পোলায় সকাল সকাল বাইর অইয়া গেল।
জায়নামাজের উপর বসেই লতার শাশুড়ি জবাব দিল
কহন আইবো কিছু কইছে?
হ, কইল ক্ষ্যাপ নিয়া অনেক দ‚রে যাবে। আসতে তার দেরীও অইতে পারে।
আচ্ছা। বলেই সোহরাপের মা দোয়া দ‚রুদ পড়তে মন নিবেশ করলো। এটা দেখে লতা ও আর কথা না বাড়িয়ে সংসারের কাজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
দুপুর গড়াইয়া বিকাল হইয়া গেছে এখন প্রযন্ত সোহরাপের কোন খোঁজ নেই। যতই সময় যাচ্ছে লতার অস্থিরতা বাড়ছে। কিছুক্ষন পর পর লতা তার শাশুড়ীর কাছে গিয়ে বলে।
আমনের পোলা তো এহনও বাড়িতে আইলো না।
আইবেনে, হয়তো দূরে কোনহানে গেছে। বৌ তুমি এত চিন্তা কইরো না। যাও সন্ধ্যা হইচে ঘরে বাতি ধরাও।
এশার নামাজ পড়ে লতার শশুর বাড়িতে ঢুকতেই উঠানের মধ্যেই বলল
আব্বা, আমনের পোলায় তো এহন ও বাড়িতে আইলো না।
কও কি? এত রাত অইলো এহনও আহে নাই। তুমি ঘরে যাও। আমি সামনে আাউ¹ইয়া দেহি।
সোহরাপের বাবা তার নিভু নিভু আলোর লাইটটা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। লতা উঠানের মধ্যে অসহায়ের মত দাড়িয়ে আছে। সোহরাপের বাবা গ্রামের বাজারের চায়ের দোকানে জিজ্ঞাসা করে। সোহরাপের বয়সী ছেলে পেলেদের কাছে সোহরাপকে দেখছে কিনা তা জানতে চায়। সোহরাপের চাচাতো ভাই বা তার বয়সী বাড়ীর মধ্যে যারা আছে। তারা সবাই রাতে বাড়িতে এসে শুনতে পায় যে, সোহরাপ এখনও আসেনি। তারা সবাই বিভিনড়ব জায়গাতে খোঁজ নেওয়ার জন্য ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ মাইক নিয়ে বের হবে কিনা সেটার জন্যও পরামর্শ করছে।
সবার রাত খোঁজাখুজিতেই চলে গেলে। সকালের সাথে সাথে গ্রামের মধ্যে মাইকের একটা ঘোষনা শোনা যায়।
“ হারানো বিজ্ঞপ্তি, হারানো বিজ্ঞপ্তি। ২৬ বছর বয়সী একজন যুবককে গতকাল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। তার উচ্চতা ৫ ফিট ৪ ইঞ্চি, গায়ের রং শ্যামলা। তার সাদা শার্ট আর প্যান্ট। যদি কোন স্বহৃদয়বান ব্যক্তি তার খোঁজ পান। তাহলে ফোন করবেন ০১৭১৬****** অথবা সদর থানায় যোগাযোগ করা জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।”
*****
মোকলেছুর রহমান পেশায় একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। মেয়ে আর তার স্ত্রীকে নিয়ে মোকলেছুর রহমান সংসার। বাড্ডার ছোট একটা ভাড়া বাসায় থাকে। বাসাটা টা ছোট হলে হাসি খুশিতে তাদের অভাবকে কোন পাত্তাই দিচ্ছেনা। যে বেতন পায় তাতে বাসা ভাড়া খাওয়া দিয়েই শেষ হয়ে যায়। বৌ বাচ্চা নিয়ে বাহিরে ঘুরে বেড়ানো, মাসে একটু বাহিরে খাবার খাওয়া, বা একটা সিনেমা দেখা আর হয়না। কিন্তু তার স্ত্রীর মাঝে বিন্দু মাত্র আক্ষেপ নেই। স্বামীর প্রতি নেই কোন অভিযোগ।
মোকলেছুর রহমান প্রতিদিন তার অফিসের দেওয়া মটরবাইকটা নিয়ে প্রথমে তাদের অফিসে গিয়ে সেখান থেকে লোকেশন ঠিক করে বিভিনড়ব হাসপাতাল, ফার্মাসিতে গিয়ে থাকে। সেদিন অফিসে যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে ডাস্টবিনের ওখানে সুন্দর পরিপাটি ড্রেস পড়া একজন লোক কি যেন খুঁজছে। প্রতি দিন এই রাস্তা দিয়ে সকাল সন্ধ্যা মোকলেছুর রহমানের যাওয়া আসা হয়। তাই ডাস্টবিনের এখানে সুইপাররা থাকে তা স্বাভাবিক এবং সেটা সব সময় চোখে পড়লেও স্বাভাবিক ভাবেই চলে যায়। কিন্তু আজ মোকলেছুর রহমানের চোখ আটকে গেল। এত সকাল সকাল এত পরিপাটি একজন লোক ডাস্টবিনে কি করে? তারপরও মোকলেছুর রহমান মোটরবাইক টেনে চলে গেল। সারাদিনের কাজের মধ্যে ও মোকলেছুর রহমানের মাথা থেকে যেন সকালে সেই অপরিচিত ব্যক্তির কথা সরাতেই পারছেনা।
*****
টিপুর মায়ের কাছ থেকে লতা টিপুকে মোবাইল করলো।
টিপু আমি তোমার লতা ভাবী।
ভাবী আমি মায়ের কাছে হুনছি সব।
তোমার ভাই কি তোমাকে এর মধ্যে কখনও মোবাইল করেছিল?
নাহ ভাবী আমাকে ফোনতো করেনি।
না মানে আমি ভাবলাম। তুমি বাড়িতে আসলে তোমার সাথে সারাক্ষন থাকতো। তাই তোমার কাছে আবার গেল কিনা?
আমার কাছে আসলে অথবা আমি কোন খবর পাইলে অবশ্যই আপনাকে জানাবো।
লতা আশাহীন হয়ে ফোনটা রেখে দিল। দুই সপ্তাহ হয়ে গেল সোহরাপের কোন খবর নাই। আস্তে আস্তে আশে পাশের সবাই সোহরাপের কথা ভুলে নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এখন সোহরাপের পরিবার ও সোহরাপের কথা ভুলে নিজেদের কাজে মন দিচ্ছে। সোহরাপের মা যখন তখন হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠে। লতা সারাদিন বাড়ির কাজ করলেও তার মাথায় শুধু স্বামীর নিখোঁজ হওয়া কথাই ভাসছে। তাদের বিবাহিত জীবনের সুখের দিন দুঃখের দিন গুলোর কথা মনে পড়ছে। স্বামীর আদর সোহাগের কথা ভেবে একা একা নিরবে কানড়বা করে।
*****
মোকলেছুর রহমানের কাজের উদ্দেশ্যে মিরপুরের দিকে যাওয়ার পথে একটা ডাস্টবিনের পাশের ড্রেনে একটা লোককে দেখে বাইকটা থামিয়ে তার কাছে গেল। অপরিচিত লোকটার পাশে গিয়ে আগে নিজে নিশ্চিত হল যে এই সেই একই ব্যক্তি কিনা? আজকে নিয়ে মোকলেছুর রহমান এই অপরিচিত ব্যক্তিকে এই এক মাসে কয়েক বার বিভিনড়ব জায়গায় দেখছে। তার মাথার মধ্যে অনেক প্রশড়ব ছিল। যা আজকে না করে শান্তি পাচ্ছিলা না।
তাই সে নিজেই ডাক দিয়ে বলল.. ও ভাই আপনি ওখানে কি খুঁজেন?
কোন উত্তর দিল না। সে তার নিজের মত ড্রেনের মধ্যে লাঠি দিয়ে খুঁজে যাচ্ছে।
ও ভাই আপনি ওখানে কি খুঁজেন?
এবার ও কোন সাড়া দিলনা। ওই অপরিচিত ব্যক্তি ড্রেনের ওখান থেকে একটু দ‚রে একটা কাটুন খুলে দেখছে যে কাটুনের মধ্যে কিছু আছে নি।
মোকলেছুর রহমান ও একটু এগিয়ে তার পিঠে হাত দিয়ে বলল..
আপনি কি খোজেন?
অপরিচিত ব্যক্তিটি পিছন ফিরে মোকলেছুর রহমানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আপনাকে আমি এর আগেও কয়েকবার দেখেছি। আপনার নাম কি? থাকেন কোথায়?
একটু সুন্দর করে বলার চেষ্টা করল ..আমার নাম সোহরাপ।
আপনি কি খোজেন?
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল..টেলিভিশনে দেখছি ঢাহাতে নাকি ডাসবিনে বাচ্চা পাওয়া যায়। এটা বলেই আবার নিজের মত ময়লা নাড়াচাড়া করছে।
কথাটা শুনে মোকলেছুর রহমান কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্দ হয়ে গেল। যখন মোকলেছুর রহমান চেতন পায় তখন সোহরাপ কিছু দ‚রে চলে গেছে। মোকলেছুর রহমান তাকে ডাকতে ডাকতে তার কাছে চলে গেল। কথা বলতে বলতে মোকলেছুর রহমানের ফোনটা হাতে নিয়ে তার ভিডিও চালু করে বলল..
ভাই রে এইভাবে কি বাচ্চা পাওয়া যায়? আর আপনি বাচ্চা দিয়ে কি করবেন?
মোর যে একটা সুন্দর কালো বউ আছে। তার লাই¹া নিমু।
কেন আপনার বাচ্চা নেই?
না। মোগো কোন বাচ্চা অয়না। জানেন? মোর সুন্দর কালো বউটার, হাসিমাখা মুখটা কত দিননননন দেহিনা। একদিন খবরে দেহি ঢাহাতে নাকি ময়লার মধ্যে বাচ্চা পাওয়া গেছে। বউটার হাসি মুখটা দেহার লাই¹া মুই ঢাহাতে বাচ্চা খোজতে আইছিলাম। বউডারে যে মুই অনেক ভালবাসি।
মোকলেছুর রহমানের চোখের কোনে অশ্রæতে ভরে গেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই গড়িয়ে পড়বে। সোহরাপকে বুঝালো এভাবে বাচ্চা পাওয়া যাবেনা। আপনি গ্রামে চলে যান। তার নিজের সাথেও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো কিন্তু সোহরাপ কিছুতেই তার সাথে যাবেনা। গ্রামের সহজ সরল মানুষ হলে কি হবে। আত্ম সম্মান বোধ আছে। মোকলেছুর রহমান
তাকে নিজের সাথে না নিতে পেরে বলল আপনি আপনার বাড়ির মোবাইল নাম্বার দেন আমি তাদের খবর দেই। সোহরাপ কোন কথা না বলে বিড় বিড় করতে করতে চলে গেল।
*****
লতা ঘর থেকে উঠানে নামতেই বাড়ির ভিতরে আসার রাস্তায় দিকে পোলাপাইনের হইচই শুনে তাকিয়ে দেখে সোহরাপকে। ও মা বলে চিৎকার দিয়ে দৌড় দিল। এক দৌড়ে স্বামীর বুকে গিয়ে পড়লো আর হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। সোহরাপের মা ঘরের মধ্যে থেকে বেড়িয়ে তার ছেলেকে দেখে সেখানেই ঠায় দাড়িয়ে কানড়বা করে দিল।
সোহরাকে চেনাই যাচ্ছে না। সেই আগের মত শরীরটা ভেঙ্গে গেছে। পড়নের পোশাকটা ময়লা আর বিভিন্ন যায়গাতে ছিড়ে গেছে। পায়ে কাদায় ভরা। চুলগুলো এলোমেলো। দাড়িতে মুখটা ভরে গেছে।
সমাপ্ত


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন